উস্তাদ/মুরুব্বী বা মেন্টর/রাহাবারের কি প্রয়োজন আছে?

আলহামদুলিল্লাহ, দাওয়াতের ব্যাপক মেহনতের (অফলাইন ও অনলাইন) কারণে দ্বীনের পথে অনেকে ভাই ও বোন ফিরে আসতেছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ এলেম অর্জন, দাওয়াহ ইলাল্লাহ মেহনতে মশগুল ও ব্যক্তিগত আমল-আখলাক পরিবর্তনের চেষ্টায় আছেন। বিশেষ করে এলেম অর্জন ও দাওয়াতি কাজে সবার মধ্যেই একটা ফিকির দেখা যাচ্ছে। আল্লাহর শোকর, জাহিলিয়াত জমানায় এমন চেষ্টা ও ফিকির নিকষ অন্ধকারের মধ্যে আলোকছটাকের মত।

আমি, আপনি ত্বলাবা, আলেম, মুবাল্লিগ ও আবেদ যেই হই না কেন, আমার সংশোধনের মেন্টর বা উস্তাদ বা তত্ত্বাবধায়ক বা শায়েখ কে? মাশা আল্লাহ, নিজ টাইমলাইন ও গ্রুপে কিংবা অফলাইনে কমবেশি দাওয়াতের মেহনত করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টায় দ্বীন শিখা হচ্ছে, কিন্তু নিজের শুদ্ধতা ও সংশোধনের জন্যে এমন কাউকে বেছে নিয়েছি কিনা যে সর্বদা গাইড করবে? আল্লাহর কসম কাটলে কাফফারা দিতে হবে না, কারও নির্দিষ্ট উস্তাদ বা শায়েখ ঠিক করা না থাকে, তার দ্বীনের মধ্যে এস্তেকামাত বা দৃঢ়তা কস্মিনকালেও আসবে না। একটা সময় পর নিজের বুঝ ও নফসের তাগিদে দ্বীন মানতে থাকবে। দ্বীনের পথে ফিরে আসার পর দাওয়াতের মেহনত ও এলেম অর্জনের ফিকিরে যতটা মশগুল হতে দেখা যায়, এই বিষয়ে ঠিক ততটা অবহেলা করতে দেখা যায়। ঘরে বাহিরে এত কঠিন ফেতনার জোয়ারে দ্বীনের উপর কতটা দৃঢ় থাকতে পারবো সেটাই দেখার বিষয়। দ্বীনের পথে প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে ঈমানের পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলে, ব্যক্তিগত আমল ও দুয়া, কান্নাকাটিতে মশগুল হওয়ার পর, নিজ প্রচেষ্টায় কিতাবাদি পড়া, অনলাইন ও অফলানে আলেম ও স্কলারদের লেখনি ও লেকচার শোনা, এবং দ্বীনের দাওয়াতে মশগুল হওয়ার পর আত্মতৃপিতে ভুগতে দেখা যায়। এই আত্মতৃপি -ই অন্তরের অনেক কঠিন রোগ ও গাফলতিকে সাময়িক ঢেকে রাখে। অনেকটা লোহার পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ফাউন্ডেশন দাঁড় করানোর মত। তখন নিজের দৃষ্টিতে নিজ ঈমান, আমল ও এলেমের দূর্বলত ধরা পড়ে না। দাওয়াত, জি হা দ, আর সমসায়িক বিষয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের ফিকিরানা লেখালেখি নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে হতে থাকে। এখলাস, তাকওয়া আর বিনয়ের গুরুত্ব অনুভূত হয় না। হায় হায়, বাহ্যিক সুরুতে কোন দ্বীনদারের অন্তরে এই তিন গুণ- এখলাস, তাকওয়া ও বিনয়ের গুরুত্ব অনুভব না হলে বুঝতে হবে তার দ্বীন ধ্বংসের পথে। শুধু নিজের ঈমান, আমল, এলেম, আর দাওয়াতের ফিকিরের ওপর অতি আত্মবিশ্বাসী থাকা শয়তানের আক্রমণকে সুযোগ করে দেয়। এই বিষয়টা লেখার মাধ্যমে বুঝাতে পারতেছি না।

দ্বীনের পথে এস্তেকামাত বা অটল আর তাকওয়া, এখলাস ও তায়াজ্জুহ বা বিনয়ের গুণ দখলে আনতে একজন যোগ্য শায়েখ বা উস্তাদ বা মেন্টরের খুব গুরুত্বপূর্ণ।
জেনারেল দ্বীনদার ত্বলাবা, মুবাল্লিগদের সংখ্যা বাড়লেও সচেতন ও সলেহ দ্বীনদার, ত্বলাবা ও মুবাল্লিগ বাড়েনি। আজ আমরা পীর মুরিদি প্রথাকে বিভিন্নভাবে অবহেলা করি। অথচ আজ অবধি উস্তাদ বা মেন্টর ছাড়া কেউ বড় হতে পারে নাই।

সবার কাছ থেকেই এলেম নেন বা কিতাব পড়ুন না কেন, একজন নির্দিষ্ট উস্তাদ বা মেন্টর ঠিক করে নেন। নিজের আকল বা বুঝের উপর কিংবা দঁড়ি ছিড়া বা লেজ কাঁটা কথিত আধুনিক শায়েখদের কথার উপর ভিত্তি করে স্বাধীন দ্বীনদার সাজতে গিয়ে নির্দিষ্ট উস্তাদ বা সংশোধকের গুরুত্বকে অবহেলা কইরেন না। অনেক মুবাল্লিগ ও মু জা হিদ ভাইদের এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের পরিণতি নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়েছে। আল্লাহ হেফাজত করেন আমাকে।

এই অনলাইনের জমানায় মুজাদ্দিদ, মুজা হিদ, মুবাল্লিগ ও মুস্তাহিদ সাজা সহজ, কিন্তু সলেহীন বা নেককার দ্বীনদার হওয়া অনেক কঠিন। অনেক কঠিন। অনেক কঠিন। তাই যোগ্য ও অধিক মুত্তাকী যুগসচেতন কোন নির্দিষ্ট আলেমকে নিজের রাহাবার বা মেন্টর বা শায়েখ আসনে স্থান দিয়ে নিজের ঈমান, আমল ও আখলাকের খাতাটাকে দাগিয়ে নিয়েন। এমন লোকের সন্ধান না পেলেও মসজিদের মুয়াজ্জিনকে দিয়ে হলেও সেই আসনের ঘাটতি পূরণ করেন। এই কথাটা আল্লামা তাকী উসমানী হাফিঃ এর একটা কিতাবে পেয়েছি। অনেক সময় খারাপ ছাত্র নিজের জুনিয়রকেও ভালো গাইড করতে পারে। এমন হলেও একজন গাইডার বা মেন্টর ঠিক করে নেন, যে নির্দ্বিধায় আপনার কর্মে আঁকাআঁকি করতে পারে। মানে সংশোধনের লোকমা দিতে পারে। ওইসব মুত্তাকী ও বিজ্ঞ শায়েখ বা ডাক্তারদের দরবারে হাজিরা দিয়ে নিজের হালত জানিয়ে ঔষধ নিয়ে এলেম অর্জন ও দাওয়াতি মেহনতে মশগুল হোন। আর যদি মনে হয় নিজ দৃষ্টিতে এমন যোগ্য শায়েখ নাই, তাহলে বলব, নিজের বদনসীবের জন্যে হাত পা ছুড়ে কান্নাকাটি শুরু করেন।

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *