রাসূল সা. এর প্রতি ভালোবাসা – ৩

বদরেরর ময়দান। নবি ﷺ চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছেন। সাহাবিরা যুদ্ধের জন্যে ময়দানে আসেননি, এসেছিলেন কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করার জন্যে। কিন্তু এখন যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে। পিছু হটার উপায় নেই। নবিজি ﷺ ভাবছেন— সাহাবিরা কি যুদ্ধ করার জন্যে রাজি হবে? মুহাজিররা না হয় রাজি হলাে, কিন্তু আনসাররা? তাঁরা তাে মদীনার বাইরে আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়নি, তা হলে? ওঁরা যদি যুদ্ধ না করে চলে যায়! নবিজি ﷺ সাহাবাদের ডাকলেন। পরামর্শ চাইলেন তাঁদের কাছে। আবূ বাকর (রাঃ) ও উমার (রাঃ) যুদ্ধ করার পক্ষে মত দিলেন। নবিজি ﷺ চাচ্ছিলেন আনসার সাহাবিরা মতামত দিক। আনসাররাই সংখ্যায় বেশি। এই মুহূর্তে তাঁদের মতামত জানাটা খুব জরুরি। আনসারদের পতাকাবাহী সাদ ইবনু মাআজ (রাঃ), নবিজির মনােভাব বুঝতে পারলেন। তিনি দৃঢ়চিত্ত কণ্ঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের মতামত জানতে চান?

নবি ﷺ বললেন, হ্যাঁ, তােমরা আমাকে পরামর্শ দাও।

ইবনু মাআজ (রাঃ) বললেন, “আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আপনার কথা শুনব ও মানব বলে ওয়াদা করেছি। আপনি আমাদের নিয়ে মােটেও চিন্তিত হবেন না। আমরা ভীরু ও কাপুরুষ নই। আমাদের ধন-সম্পদ আপনার জন্যে, যত প্রয়ােজন হয় খরচ করুন। যেদিকে খুশি, আমাদেরকে নিয়ে চলুন। আল্লাহর শপথ! আমরা একজনও পেছনে পড়ে থাকব না। ইন শা আল্লাহ শত্রুর মােকাবিলায় আমাদের যােগ্যতা ও কৃতিত্ব দেখে আপনার চোখ জুড়াবে। আল্লাহর শপথ! আপনি যদি আমাদের সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, আমরা তা-ই করব। আপনি যদি আমাদের আগুনে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, আমরা সেটাও পালন করব। আমাদের নিয়ে সামনে বাড়ন।[ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৪৬২]

তুমি কি ইবনু মাআজ (রাঃ) -এর কথাগুলাে মন দিয়ে শুনেছ? তাঁর কথামালা থেকে তুমি কী বুঝতে পারলে।

জবাবটা আমিই দিচ্ছি, তুমি মিলিয়ে নাও।

নবিজির ﷺ ভালােবাসার সামনে সাহাবিরা তুচ্ছ মনে করতেন নিজের জীবন-সম্পদ-ক্যারিয়ারকে। নিজেদের ভালােলাগার ওপরে প্রাধান্য দিতেন নবিজির ﷺ ভালােলাগাকে। নিজেদের বিলিয়ে দিতেন তাঁর যে-কোনাে সিদ্ধান্তের সামনে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন তাঁর প্রতিটি কথা। তাঁরা সব সময় ভাবতেন—জীবন যায় যাক, আপত্তি নেই। ধনসম্পদ শেষ হয় হােক, কোনাে পরােয়া নেই। সবার আগে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ। নবি ﷺ যদি বলেন আগুনে ঝাঁপ দিতে, আমরা নির্দ্বিধায় ঝাঁপ দেব। তিনি যদি বলেন সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে, বিনা বাক্যে সেটা মেনে নেব। তাঁর ভালােবাসার সামনে যে-কোনাে ত্যাগ স্বীকার করব।
একবার এক সাহাবি কিয়ামাত সম্পর্কে জানার জন্যে নবিজির ﷺ কাছে এল। তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। সালাত শেষ করে নবিﷺও বললেন, ‘কিয়ামাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকারী লােকটি কোথায়?
সে সাহাবি বলল, এই যে আমি।
-তুমি কিয়ামাতের জন্যে কী প্রস্তুতি নিয়েছ?
-“হে আল্লাহর রাসূল ﷺ! বেশি বেশি সালাত কিংবা সাওম নিয়ে আমি এর জন্যে প্রস্তুত হতে পারিনি। তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ﷺ ভালােবাসি।
-“যে ব্যক্তি যাকে ভালােবাসে, সে তার সাথেই জান্নাতে থাকবে। তুমিও যাকে ভালােবাসাে, তার সাথেই থাকবে।”[বুখারি, আস-সহীহ, অধ্যায় : আম্বিয়া কিরাম, হাদীস : ৩৪২৩]

সাহাবিরা সব সময় ভাবতেন—একদিন আমরা মারা যাব, নবিজিও ﷺ মারা যাবেন। তিনি থাকবেন জান্নাতের অনেক উঁচু স্তরে। আর আমরা যদি জান্নাতে যাইও, তবে আমাদের স্তর কখনােই তাঁর সমান হবে না। কিন্তু সে জান্নাত কী করে জান্নাত হতে পারে, যেখানে তিনি ﷺ আমাদের পাশে নেই? সে সুখ কীভাবে প্রকৃত সুখ হতে পারে, যে সময়ে তিনি আমাদের কাছে নেই?
তারা যখন জানতে পারলেন—মানুষ তার ভালােবাসার মানুষের সাথে জান্নাতে থাকবে—তখন তাদের অন্তর তৃপ্ত হলাে। হােক না তাদের আমল নবিজির চেয়ে কম, কিন্তু তাঁকে ভালােবাসার কারণে তাঁরা নবিﷺ -এর সাথেই জান্নাতে থাকবেন। আনাস(রাঃ) বলেন, এই হাদীস শােনার পর মুসলিমরা এত আনন্দিত হয়েছিল যে, ইসলামে আসার পর আর কোনাে বিষয়ে তাঁদের এতটা আনন্দিত হতে দেখিনি।” [বুখারি, আস-সহীহ, অধ্যায় : আম্বিয়া কিরাম, হাদীস : ৩৪২৩]
নবিজিকে ﷺ সাহাবিরা এমনভাবে ভালােবেসেছেন, কাফিররা তা দেখে অবাক হয়েছে। এমন ভালােবাসার নজির ﷺ এর আগে তারা দেখেনি। এটা আমার মৌখিক কোনাে দাবি নয়, সত্যি। হুদায়বিয়ার সন্ধির কথা হয়তাে তােমার মনে আছে। সে সময়কার একটি ঘটনা শােনালে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে।

হুদায়বিয়ার দিন কুরাইশরা নবি ﷺ -এর সাথে কথা বলার জন্যে বুদায়লকে পাঠাল। নবিজি ﷺ বুদায়লকে সন্ধি করার প্রস্তাব জানালেন। নবিজি ﷺ রাজি হলেন। বুদায়ল সন্ধির প্রস্তাব পৌঁছে দিল কুরাইশদের কাছে। বুদাইলের থেকেও প্রবীণ কাউকে পাঠানাের সিদ্ধান্ত নিল কুরাইশরা। উরওয়া ইবনু মাসউদ ছিল ওদের মধ্যে প্রবীণ, কুরাইশরা তাকেই পাঠাল। উরওয়া দেখা করতে এল নবিﷺ -এর সাথে। সে বলল, “হে মুহাম্মাদ! আপনি কি আপনার জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চান? আপনি কি এর আগে এমন কাউকে দেখেছিলেন, যে তার জাতিকে সমূলে উৎপাটন করতে উদ্যত হয়েছিল? আল্লাহর শপথ! আমি আপনার পাশে এমন কিছু লােক দেখতে পাচ্ছি— যারা যুদ্ধ শুরু হলে আপনাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে।

উরওয়ার কথা শুনে সাহাবিরা অবাক হলেন। এই নির্বোধটা বলে কী? ও কি দেখেনি, মক্কায় শত অত্যাচারের মধ্যেও নবিজির ﷺ সাথিরা তাঁকে কীভাবে আগলে রেখেছিল? ও কি দেখেনি, বদরের যুদ্ধে তাঁর ﷺ সাথিরা কেমন বীরত্ব দেখিয়েছিল? ও কি ভুলে গেছে, উহুদের যুদ্ধে সাহাবিরা কীভাবে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে নবিজিকেﷺ রক্ষা করেছিল? তা হলে? এমন কথা কীভাবে বলল সে? আবু বাকর (রাঃ) রাগান্বিত হয়ে বললেন, যাও ভাগাে। গিয়ে লাত ও উযযার লজ্জাস্থান চুষাে।

উরওয়া বলল, ‘এই লােকটি কে?’
নবি ﷺ বললেন, ‘আবু বাকর’

উরওয়া আবার কথা বলতে আরম্ভ করল। কথার ফাঁকে ফাঁকে সে নবিজির দাড়িতে হাত দিচ্ছিল। তখন মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) একটি তলােয়ার দিয়ে মৃদু আঘাত করে উরওয়ার হাত নামিয়ে দিলেন। মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) বললেন, রাসূলের ﷺ দাড়ি থেকে তােমার হাত সরিয়ে নাও।

উরওয়া বলল, ‘এ কে?’
নবি ও বললেন, ‘সে মুগীরা ইবনু শুবা।”

কথা শেষ হলে কিছুক্ষণ আড়চোখে সাহাবাদের পর্যবেক্ষণ করল উরওয়া।
কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, হে আমার জাতি! আল্লাহর শপথ! আমি পারস্য ও আবিসিনিয়ায় দূত হিসেবে গিয়েছি, কিন্তু কোনাে রাজা-বাদশাহকেই মুহাম্মাদের ﷺ অনুসারীদের মতাে এতটা ভালােবাসতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ যদি থুতু ফেলেন, তবে সাথে সাথে তাঁর সাথিরা তা গায়ে ও মুখে মেখে নেয়। তিনি যখন ওজু করেন, তখন ওজু থেকে গড়িয়ে পড়া পানি নিয়ে তাঁর সাথিরা প্রতিযােগিতা শুরু করে দেয়। তিনি যখন কোনাে আদেশ দেন, তখন তাঁর সাথিরা তা পালনের জন্যে অস্থির হয়ে যায়। তিনি যখন কথা বলেন, তাঁর সাথিরা তখন তা কান লাগিয়ে শােনে। কথা শােনার সময় কেউ তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকায় না। হে কুরাইশরা! তােমরা মুহাম্মাদের কথা মেনে নাও।”[বুখারি, আস-সহীহ, অধ্যায়: শর্তাবলী, হাদীস: ২৫৪৭; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪/৩২২-৩৩২; ইবনু কায়্যিম, যাদুল মাআদ, ২/৩৪৮, শফিউর রহমান, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা: ৩৬৬]

কী, এবার আমার কথা বিশ্বাস হলাে তাে?
এই হলাে সত্যিকার ভালােবাসা, যার নজির সাহাবিরা আমাদের সামনে রেখে গেছেন। তাঁরা নবিজিকে ﷺ এমনভাবে ভালােবেসেছেন, যা দেখে কাফিররা যারপরনাই বিস্মিত হয়েছে। বিশ্ব সারপ্রাইজড হতে বাধ্য হয়েছে তাদের ভালােবাসা দেখে। একেই বলে সত্যিকার ভালােবাসা। এটা ক্লোজ-আপের কাছে আসার অ্যাড নয়। রিয়েল লাভ।
ভাই আমার! সততার সাথে বলাে তাে, তুমিও কি সাহাবিদের মতাে নবিজিকে ভালােবাসতে পেরেছ?

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *