সত্যের অপলাপ ও ইতিহাসের বিকৃতি প্রকাশক হয়ে গেলেন অনুবাদক

সত্যের অপলাপ ও ইতিহাসের বিকৃতি
প্রকাশক হয়ে গেলেন অনুবাদক

শুরুর শুরু:
আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করি – আল কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক কে? আপনি জটপট বলবেন গিরীশ চন্দ্রসেন। আপনি কোনো মুসলমানের নাম বলবেন না, বলবেন একজন হিন্দু ব্রাহ্মণেরই নাম। আপনি আপনার জ্ঞানের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারবেন না। কারণ, ছোটোকাল থেকেই আপনি জেনে এসেছেন যে, একজন হিন্দু পণ্ডিত হলেন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদক।

অথচ আপনি আমি জানি না যে, গোয়েবলসীয় নীতির যাঁতাকলে পড়ে সত্য ইতিহাস যে বিকৃত হয়েছে, যেমনি জানে না বাংলার অধিকাংশ মুসলমান। তারা এটাও বিকৃতভাবে জানে যে, হযরত উসমান রা. এর সঙ্গে হাসান হুসাইনের আপন খালা কুলসুমের বিবাহ, কিন্তু দাওয়াত পান নি হতদরিদ্র আলী ও ফাতেমা রা.। কাঁদে হাসান হুসাইন রা.। তাঁদের ছাতিফাটা কান্না বিশ্বনবীকে জানান দেয় তাঁদের বঞ্চনার কথা! এটাও ছোটোকাল থেকে জানা বিষয়! ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল- মার্কা বিষয়। লাখে লাখে মানুষ মরে হাজারে হাজার, গণিয়া দেখা যায় ১১হাজার!
কাজেই, নিকট অতীতের গাজী খালু চাম্পাবতী, বদিউজ্জামাল সয়ফুল মুলুক, আর হালতুনন্নবীর পুঁতির ঘটনার মতোই বিকৃত কয়েকটি ঘটনার অন্যতম হলো পবিত্র কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদের প্রসঙ্গটি।

হিটলারের মন্ত্রক গোয়েবলস বলে গেছেন, অধিক প্রচারে মিথ্যাকেও মানুষ অকাট্য সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য। সুতরাং এই গোয়েবলসীয় নীতির যাঁতাকলে পৃষ্ট ও বিকৃত আজকের আলোচ্য বিষযটি। চলুন তাহলে মূল তথ্যটি জানা হোক।

মূত তত্ত্ব ও তথ্য:
মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ সালে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় কুরআন কারীমের আংশিক অনুবাদ করেন। এরপর ১৮৩৬ সালে বাংলা ভাষায় কুরআন করীমের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন মৌলভী নাঈমুদ্দীন।

গিরীশচন্দ্রসেন শুধু উক্ত অনুবাদ পুস্তকাকারে সন্নিবেশ করেন। তাই ভাই গিরীশচন্দ্র হচ্ছেন প্রকাশক। তাও সে সময়টা ছিল অনেক পরে, ১৮৮৬ সালে।

সুতরাং কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে মুখস্থ বিদ্যায় এতদিন যা জেনে আসছেন, তা ঠিক নয়। অর্থাৎ প্রথম অনুবাদক ভাই গিরীশ চন্দ্র সেন নন, বরং মৌলভী নাঈমুদ্দীনই পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক। আর মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া হলেন বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের প্রথম আংশিক অনুবাদক।

আরও বলি, গিরীশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৫ সালে এবং মৃত্যু ১৯১০ সালে। গিরিশ চন্দ্রের জন্মেরও আগে অর্থাৎ ১৮০৮ সালে কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদের কাজ শুরু করেন মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া রহ.। এরপর গিরীশচন্দ্র সেনের জন্মের এক বছর পরই অর্থাৎ ১৮৩৬ সনে মৌলভী নাঈমুদ্দীন রহ. পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন।

আরবি জানে না, আরবি ব্যাকরণ সম্পর্কে অবহিত নন, এমন ব্যক্তি কুরআন অনুবাদ করেছে এমন প্রচার মূর্খতা বৈ কিছুই নয়। (তাও জন্মের এক বছর পর)!

আরেকটি কথা-
গিরীশচন্দ্রসেন প্রকাশিত (অনূদিত নয়) কুরআনের বাংলা অনুবাদে এমনকিছু শব্দ ও পরিভাষা রয়েছে, যা কিছুতেই মেনে নেয়ার মতো নয়। যেমন-
আল্লাহকে বলা হয়েছে ‘ঈশ্বর’, মালাক বা ফেরেশতাকে ‘দেবদূত’, সালামকে ‘প্রণাম’ এবং রুকুকে ‘কুর্নিশ’। হিন্দুয়ানি পরিভাষা দিয়ে ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষার এরকম মারাত্মক বিকৃতি ঘটানো হয়েছে তাতে।

?? এবার বলি, গিরীশ চন্দ্র সেন আল কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে প্রচারণার কারণ:

বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে যে, গিরীশ চন্দ্র সেন আল কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক। এ প্রচারণার কারণ কী ছিল তা নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।

ব্রিটিশ আমলে এদেশে ব্রাহ্ম ধর্মের মতো একটি নতুন ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। গোঁড়া হিন্দু গিরীশচন্দ্রসেন এক পর্যায়ে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ব্রহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মধর্ম এ দেশে যেহেতু একটি নতুন ধর্মমত, তাই এ ধর্মমত আপামর জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের জন্য গিরীশচন্দ্রসেন নিজে উদ্যোগী হন। কিন্তু অর্থকড়ির তো প্রয়োজন। তা আসবে কোথা থেকে? তাই মুসলমানদের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি আঁটলেন। সে সময়কার কিছু অগ্নি পূজক পণ্ডিত মুসলমানদের পকেট থেকে টাকা বের করার জন্য বেশ কিছু ইসলামি বই রচনার পরামর্শ দিলেন।

তখনকার সমাজব্যবস্থা ছিল বর্তমান থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়া। তিনি সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে এবং সেই সাথে পবিত্র আল কুরআনেরও প্রকাশক হলেন। মুসলমানরা এসব বই কিনলও প্রচুর। ফলে বাংলা ভাষাভাষী যারাই কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ হাতে পেতে চাইলো তাদের হাতে পৌঁছে গেলো তার অনূদিত কুরআন শরীফ। এ ব্যাপারে তাঁকে ব্রাহ্মসমাজ তথা হিন্দু ব্যক্তিবর্গ এমন কি ফিরিঙ্গি- ব্রিটিশরাও যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। ফলে মানুষ মনে করেছে পবিত্র কুরআন শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী হচ্ছেন গিরীশচন্দ্রসেন।

আসলে পবিত্র কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী যে মৌলভী মুহাম্মদ নাঈমুদ্দীন সে কথা অল্প কিছু লোক জানলেও ব্যাপকভাবে প্রচার করার সুযোগ আসেনি।

গিরীশচন্দ্র কুরআনের অনুবাদ বিক্রি করে যে অর্থ লাভ করতেন তা ব্যয় করতেন ব্রহ্মধর্ম প্রচারের কাজে। ফলে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের মিশনের সাথে কুরআন বিক্রয়ের একটা গভীর সম্পর্ক ছিল!!

মৌলবী মুহাম্মদ নাঈমুদ্দীন ছিলেন একজন মুসলমান। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। তা প্রচারের জন্য গিরীশচন্দ্রসেনের মতো কোনো মিশন ছিল না। যার কারণে তার প্রচার প্রসার ছিল সীমিত। ফলে, আল কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী হয়েও মৌলবী মুহাম্মদ নাঈমুদ্দীন প্রকাশক গিরীশচন্দ্রসেনের মতো অনুবাদকরূপে প্রচার পেতে পারেন নাি।”

পবিত্র কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক নিয়ে ভুল প্রচারণাটির নিরসন হোক।

তত্ত্ব-তথ্য-সূত্র সংগৃহীত। (মাহবুব সীরাজী)

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *